শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০১১

রূপগঞ্জে জামদানী পল্লী: কারিগরদের সীমাহীন ব্যস্ততা

রোজার  ঈদকে সামনে রেখেএবার নারীদের কেনাকাটায় পছন্দের তালিকায় রয়েছে জামদানী শাড়ী। ক্রেতাদের ব্যাপক  চাহিদা কারনে নিঘুর্ম রাত কাটাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানী পল্লীর কারিগররা। শত বছরের প্রাচীন জামদানী শাড়ীর কারিগররা মনকাড়া  বাহারি ডিজাইনের একের পর এক শাড়ি তৈরি করছে।কিন্তু কারিগরদের অভিযোগ কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরী পাচ্ছেনা  তারা। বংশ পরম্পরায় জামদানী পল্লিতে কাজ করে যাচ্ছে প্রায় কয়েক হাজার কারিগর। রুপগঞ্জের জামদানী শাড়ি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল চাহিদা রয়েছে। জামদানী শাড়িপাইকারি ও খুচরা বেচাকেনার একমাত্র  হাট বসে ডেমরার শীতলক্ষা নদীর পশ্চিম পাড়ে। প্রতি শুক্রবার গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত প্রস্তুতকারি মহাজন,ফড়িয়া ও দেশী বিদেশী ক্রেতাদের মিলন মেলা বসে এ হাটে।আদিকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জের উৎপাদিত জামদানী শাড়ি সারাবিশ্ব ব্যাপি সমাদৃত । শত বছর আগ থেকেই রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জে জামদানী শাড়ি তৈরি হয়ে আসছে। এ অঞ্চলে জামদানী তৈরির কয়েক হাজার তাঁেতর সাথে প্রায় তিন হাজার  নারী ও পুরুষ কারিগর জড়িত রয়েছে। রূপগঞ্জে গড়ে উঠেছে বিসিক জামদানী পল্লী। প্রতি বছর এ পল্লিতে চাহিদা অনুযায়ী কয়েক লাখ জামদানী শাড়ি তৈরি হয়।  বংশ পরম্পরায় এসব কারিগর জামদানী শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।জামদানী কারিগর সাখাওয়াত ও বাদশা মিয়া জানান, জামদানীর অতিত ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা।। বর্তমান বাজারে পাচঁ হাজার  টাকা থেকে শুরু  করে ৪০/৫০ হাজার টাকা দরে জামদানী শাড়ি ও থ্রি পিস  তৈরি করা হয়।  একটি শাড়ি তৈরি করতে দুই জন কারিগরের এক সপ্তাহ থেকে প্রকার ভেদে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু কারিগররা পরিশ্রম অনুযায়ী সে পরিমান পারিশ্রমিক  পায়না । জামদানীর কারিগরা মহাজনের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। তাদের কাছ থেকে অগ্রিম শাড়ি,থ্রি পিস কিনে নিয়ে এ সকল মহাজনরা ডেমরা হাটে বিক্রি করে মোটা অংকের লাভ গুনছে। রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোতে রূপগঞ্জের জামদানীর কদর রয়েছে। এদিকে রূপগঞ্জের জামদানী পল্লীর তাঁতীরা সরাসরি হাটে এনে তাদের উৎপাদিত শাড়ি বিক্রি করতে পারছে না। এক শ্রেণীর দালাল চক্র গড়ে উঠেছে যারা তাঁতীদের কাছ থেকে কম মূল্যে শাড়ি ক্রয় করে হাটে অথবা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শপিংমল গুলোতে সরবরাহ করে অধিক মুনাফা লুটে  নিচ্ছে। একাধিক কারিগর অভিযোগ করেন, দালালরা তাদের জিম্মি করে রেখেছে। এক শ্রেনীর মহাজনরা অগ্রিম দাদন দিয়ে শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, দশ হাজার টাকা মূল্যের একটি জামদানি শাড়ি বুঁনে তারা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা মজুরি পায়। আট/দশ দিন ব্যয় হয় এ শাড়িটি বুঁনতে। মূল কারিগর এর সাথে একজন সহকারি কাজ করে। তাকে আটশ’ থেকে এক হাজার টাকা দিতে হয়। ফলে মূল কারিগর দুই হাজার টাকার বেশী মজুরি পায় না। তারা জানান বংশ পরম্পরায় এ শিল্পের কারিগর তৈরী হচ্ছে। ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ার কারনে জামদানি শিল্পে এখন কারিগর পাওয়া যায় না। এদিকে জামদানি ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামান  জানান, জামদানি কারিগরদের অভিযোগ অনেকটা সত্য। তিনি বলেন, জামদানি পল্লীর দালালরা তাদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে গিয়ে তৈরী করে এনে হাটে কিংবা দোকানে নিয়ে এসে বিক্রি করে যায়। আমরা প্রকৃত তাঁতীদের কাছ থেকে শাড়ি ক্রয় করতে পাড়ি না। রূপগঞ্জে তাঁতীদের কাছ থেকে দালাল কিংবা মহাজনরা যে শাড়িটি দশ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে আসে সে টি তিন চার হাত ঘুরে একটি শপিংমলে আসার পর পচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তাঁতীরা এ অতিরিক্ত মুনাফার কোন সুফল পাচ্ছে না। তিনি জানান, দেশের বাইরেও জামদানি রপ্তানি হচ্ছে। ভারত থেকে সরাসরি ক্রেতারা ডেমরার জামদানি হাটে এসে শাড়ি ক্রয় করে থাকে।আদিকাল থেকেই প্রতি শুক্রবার মধ্য রাত থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে  ডেমরা ঘাটে বসে জামদানীর হাট। এখানেই সপ্তাহে একদিন বেচা কেনা হয় জামদানী শাড়ির। দেশী বিদেশী পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা কিনে নিয়ে যায় বাহাড়ি ডিজাইনের জামদানী শাড়ি ও থ্রি পিছ।জামদানীর  কারিগরারা মনে করনে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরেদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে জামদানী তৈরির পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে কারিগররা। হাড়িয়ে যাবে জামদানী শিল্প।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ