বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০১১

চট্টগ্রামে অলি-গলিতে মাদক

সর্বনাশা মাদকের ছোবলে যুবক, বয়স্কদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর পথশিশুরাও আসক্ত হয়ে পড়ছে। ভয়াবহ মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে অন্ধকার জীবনে চলে যাচ্ছে পথ শিশুরা। এসব পথশিশুদের বেশীরভাগ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, যাদের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে বয়স্কদের পাশাপাশি পথশিশুদের বিভিন্ন নেশার আসর বসে। গত কয়েকদিনে নগরীর বস্তিগুলোতে, রেললাইনসহ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে এ চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে নগরীর স্টেশন রোড এলাকায় বেশীরভাগ পথশিশু নেশার আসরে ডুবে থাকে দিবা-রাত্রির বেশীর ভাগ সময়। এদের থাকার কোন জায়গা নাই। সারা দিন স্টেশনে থাকে। মাদক সেবনের পাশাপাশি গাঁজা, ফেনসিডিল, চোলাই মদসহ বিভিন্ন প্রকারের মাদক পাচার , বিক্রি ও সেবন করে আসছে তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পথশিশুদের মাদক সেবনের মধ্যে বেশীর ভাগ প্রচলন রয়েছে মরণঘাতি নেশা ড্যান্ডি। নগরীর বাস স্টেশন, রেল স্টেশন ও বস্তিগুলোতে শিশুদের মাদক হিসেবে এটি সংযোজিত হচ্ছে। নগরীর স্টেশন রোডে সম্প্রতি পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের ৪ নম্বর প্লাটফর্ম ডিঙিয়ে ওয়াগনের পাশে নির্জন ঝোপের ধারে একদল ড্যান্ডি আসক্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। জানা গেলো এখানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী পথশিশুদের নেশার আড্ডা বসে। দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে জমে উঠে পথশিশুদের ড্যান্ডি টানার আসর। দেখা গেল একদল পথ শিশু বসে ঝিমোচ্ছে আর পলিথিন থেকে কি যেন টানছে। নাম জিজ্ঞেস করতে একে একে বলে উঠল কাউসার, বিল্লাল, রাজু, আজমল, মনির, সেলিম, কবির। তোমরা এখানে কি করছো? প্রশ্ন শেষ না হতেই একজন চোখ বুঝে জড়ানো গলায় বলে উঠল, ড্যান্ডি বানাইয়া খাই, বুজছেন এবার? আর একজন বলে উঠল, বুঝে নেই মনে হয়। তাহলে আপনারে কই, এ বলে দলের একজন দেখাতে শুরু করল ড্যান্ডি তৈরীর কায়দা কানুন। ওদের কাছ থেকে জানা গেল, ড্যান্ডি খুব সহজলভ্য নেশা। জুতা জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত বিশেষভাবে তৈরী আইকা গাম ড্যান্ডির প্রধান উপকরন। কোটা থেকে সামান্য আইকা গাম নিয়ে ছোট পলিথিন ব্যাগের ভিতরে লেপ্টে দেয়ার পর পলিথিনে ফু দিয়ে ফুলিয়ে এর ভিতরে নাক মুখ ঢুকিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলে মাথায় ঝিমুনি ধরে, নেশা হয়। পথশিশু সেলিম জানায়, এ নেশার খরচ কম, ড্যান্ডি খেলে ক্ষুধা লাগেনা, মনে কোন দুঃখ থাকেনা। ছোট বেলা থেইক্যা বাপরে দেহি নাই, কয় দিন হল মা আরেকজনের লগে বিয়া বইছে। নতুন বাপের লগে আমার বনেনা। এহন স্টেশনে থাকি। আরো কয়েক জন পথশিশুর সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্টেশনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বস্তি ও নির্জনস্থান গুলোতে মদ ফেনসিডিল গাঁজা, হেরোইন, এসব পাচার করে যে অর্থ পায় তা দিয়ে খাবার খায় আর বিভিন্ন মাদক কিনে নেশায় বুদ হয়ে থাকে এসব পথশিশুরা। একদিন খাবার না খেলে তাদের চলে, কিন্ত নেশা না করলে তাদের  চলেনা। ঘুম হয়না, বুক জ্বলে। পরিণত বয়সের নেশাগস্থদের মত আধশোয়া অবস্থায় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কথাগুলো বলছিল আনুমানিক ১২-১৩ বছর বয়সী পথশিশু আলম। চট্টগ্রাম শহরের অনেক পথশিশু এখন ড্যান্ডিসহ বিভিন্ন মরনঘাতি নেশাতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’র সুপারভাইজার কিশোর কুমার রায় বলেন, মাদককের ভয়াবহ ছোবলে পথ শিশুদের আক্রান্ত হবার খবর অনেক আগ থেকে শুনে আসছি। তবে এতে শিশুরা শারিরীক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলেও জানতে পেরেছি। এ ব্যাপারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য অধিকার ভিত্তিক সেবা প্রদানকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ‘অপরাজয়ের বাংলাদেশের’ হিসেব মতে বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে পথ শিশুর সংখ্যা ৫৫ হাজার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, কোতোয়ালী, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, এলাকায় পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এসব অধিকাংশ শিশুই সামান্য অর্থের বিনিময়ে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। নিজেরাও হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। বেসরকারী এ প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক প্রধান পথ শিশুদের ব্যাপারে জানান, পথশিশুদের নেশার কবল হতে রক্ষা করতে আমাদের “ চাইল্ড টু চাইল্ড কনট্রাক” কার্যক্রম আরো জোরদার করছি। নগরীতে পথ শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে মাদক সেবনকারীর সংখ্যাও। মাদক ব্যবসাযীরা যাতে পথশিশুদের ব্যবহার করতে না পারে সে লক্ষ্যে আমরা পুলিশের সাথে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। জানা গেছে, অভাব ও বেকারত্বের সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের দিয়ে মাদকদ্রব্য বেচা-কেনা ও পাচার করায় আসক্ত হয়ে পড়েছে এসব কোমলমতি পথ শিশুরা। এসব মাদক ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ বাসের ও টেম্পুর শিশু হেলপার, টোকাই ও ভবঘুরে, যাদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। যেখানেই রাত সেখানেই বাসস্থান। বিভিন্ন ফুটপাত, রাস্তা, কাঁচা বাজার ও শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের নিচে তারা রাত কাটায়। দরিদ্র ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্টীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথ শিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি পথ শিশুদের শিক্ষা , আশ্রয় ও মাতৃস্নেহ আদর যত্নে ভুলিয়ে দিতে পারতো মা হারানো কষ্ট, তাহলে এসব পথশিশুরা ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে সমাজ ও রাস্ট্রের বিশেষ ভূমিকা রাখা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ