বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১১

হিমায়িত চিংড়িতে অপদ্রব্য: ফেরত আসছে চালান

ডিপো মালিক ও ফড়িয়াররা নানা ধরনের অপদ্রব্য চিংড়িতে প্রবেশ করিয়ে এর ওজন বাড়াচ্ছে। চিংড়ির দেহে সাগুও পাশাপাশি জেলি নামক পাউডার প্রবেশ করাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষ ওজন বাড়াতে চিংড়ি পানিতে ভিজিয়ে রাখে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের রপ্তানি যোগ্য পণ্য চিংড়িতে তরল পদার্থ্য প্রবেশ করানো রপ্তানি বাণিজ্য হুমকির মুখে বলে জনপ্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অপদ্রব্য মিশানোর কারণে এ বছর বিদেশ থেকে দু’টি চিংড়ির চালান ফেরত এসেছে।
ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছেন, বাগদা চিংড়ির মৌসুম শুরুর সাথে সাথে ওই সব দূর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা হিমায়িত চিংড়ি মাছে পুশে’র প্রতিযোগীতা শুরু করেছে। দেশের দ্বিতীয় বৈদেশীক মুদ্রা অর্জনকারী হিমায়ীত চিংড়ি শিল্প আজ মারাÍক হুমকির মুখে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের ছোট ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ডিপো মালিক, মধ্যভোগী এজেন্ট ব্যবসায়ীরা পরস্পর অধিক লাভবানের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত চিংড়ি মাছে অপদ্রব্য পুশ করে চলেছে। সূত্র জানায়, ভার থেকে অবৈধ পথে আসা দু’ধরণের পাউডার মিশ্রিত করে এই জেলি পাউডার তৈরী করে বাগদা ও গলদা মাছের দেহে পুশ করা হয়। খুলনার বড়বাজারের একটি দোকান থেকে রূপসার এক মাছ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এদের মাধ্যমে কিনে এনে অন্যান্য ব্যাবসায়ীদের মাঝে সরবরাহ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মাছ ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানের এই জেলি অত্যান্ত আঠালো হওয়ায় সহজে এসব পূশ মাছ ধরা পড়েনা। চিংড়ি সেক্টরের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে পূর্ব রূপসায় এমন কোন চিংড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই যারা কমবেশি পুশের সাথে জড়িত নেই। বিভিন্ন মাছের ঘরে এই জোলি পুশ করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা (কক্ষ) রয়েছে। তবে যে সব ঘরের নিজস্ব পুশ ব্যবস্থা নেই তারা ওই জেলি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কেজি প্রতি ১০টাকা করে পুশ করিয়ে নেয়। এভাবে ওই পুশ সিন্ডিকেট প্রতিদিন কমপক্ষে ৫/৬’শ কেজি মাছ পুশ করিয়ে থাকে বলে একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান। মাছ ব্যবসায়ী ওমর আলী জানায়, ব্যবসায়ীরা পুশ না করে চালান বাঁচাবে কিভাবে? তিনি বলেন, কোম্পানী থেকে যে রেট-পিচ ঘোষনা দেয়া হয় মোকামে একই গ্রেটের মাছের রেট-পিচ থাকে অনেক বেশি। তিনি বলেন, পূর্বে এ এলাকায় পূশ পদ্ধতি ছিলনা। মুলত সাতক্ষীরা-কালীগঞ্জ এলাকার ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা প্রথম শুরু করে। পরে এটা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে গত ৯ মাসে রূপসা উপজেলা প্রশাসন ও  খুলনা মৎস্য অধিপ্তর পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত একটি মাছ কোম্পানীনহ ১০ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় দু’লাখ টাকা জরিমানা করে। এরপর র‌্যাব-৬ ও মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রন অধিদফতর অভিযান চালিয়ে নগরীর নতুন বাজার এলাকার একটি মাছের আড়ত থেকে প্রায় ১৫ মণ অপদ্রব্য পুশ করা বাগদা চিংড়ি উদ্ধার করে নদীতে ফেলে বিনষ্ট করেছে। জেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভায় রূপসা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আলী আকবর জানান, মহানগরী পূর্ব পাড়ে হিমায়িত চিংড়ির বড় ধরনের একটি জোন গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। রপ্তানিকৃত চিংড়িতে বিভিন্ন অপদ্রব্য পুশ করা। তিনি বলেন, এই জোনে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর শ শ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে এই সেক্টর থেকে। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী চিংড়িতে পুশ করে দেশের সুনাম নষ্ট করায় এই সেক্টর হুমকি স্বরুপ। এ ব্যাপারে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ সভায় রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, চিংড়িতে তরল পদার্থ পুশ বন্ধে মৎস্য বিভাগের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। মৎস্য বিভাগে দেওয়া সনদ প্রাপ্ত চিংড়িতেও পুশ পাওয়া যাচ্ছে। ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাদী সভায় উল্লেখ করেন, মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তিনি এই পদে বহাল থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি বিশ্ব বাজারে সুনাম হারাবে বলে এই সূত্র উল্লেখ করেন। চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সভায় উল্লেখ করেন, অসাধূ ব্যবসায়ীরা চিংড়িতে তরল পদার্থ পুশ করলেও মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রন বিভাগের কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মৎস্য বিভাগ অসাধু ব্যবসায়ীদের এ অপতৎপরতা বন্ধে পুলিশী সহায়তা নিচ্ছে না। মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ উপ-পরিচালক ড. নিত্যা নন্দ দাস সভায় উপস্থাপন করেন চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। গত বছর ২২শ’ চালান বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। নানা অভিযোগে পরিপ্রেক্ষিতে দু’টি চালান বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে। উল্লেখ্য, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো খুলনার সহকারী পরিচালক মোঃ বখতিয়ার জালাল জানান, ২০১০ সালে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা মূল্যের ২ কোটি ৯৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫৬৬ কেজি মাছ ১৫টি দেশে রপ্তানি হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ