বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১১

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের ৫০ বছর

বাংলাদেশের কৃষি সংস্কৃতিতে বার বার আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে দারিদ্রতা দূরীকরণের প্রত্যয়ে দেশকে একটি শক্তিশালী আর্থ-সামজিক অবকাঠামো উপহার দিয়ে আগামী ১৮ আগস্ট উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ও কৃষি শিক্ষার তীর্থ স্থান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পালন করতে যাচ্ছে গৌরবের ৫০ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী। ১৯৫৯ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন এবং খাদ্য ও কৃষি কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশের উপর ভিত্তি করে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১৯৬১ সালের ৮ জুন এবং এর অধ্যাদেশ জারি হয় – ১৯৬১ সালের ১৮ আগষ্টে। ২ সেপ্টেম্বর প্রথম উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. এম ওসমান গণির নিযুক্তি লাভের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তব রূপ লাভ করে। এবং ময়মনসিংহের ভেটেরিনারি কলেজ প্রাঙ্গণকে ঘিরে শুরু হয় কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম। ময়মনসিংহ শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম প্রান্তে চিরসবুজে ঘেরা গ্রামীণ পরিমণ্ডলে ১,২০০ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যা¤পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৬ অনুষদ ভবন, প্রশাসন ভবন, ছাত্রদের ৯টি এবং ছাত্রীদের ৩টি আবাসিক ভবন। এছাড়াও রয়েছে একগুচ্ছ গবেষণা খামার, উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফলের জাত উন্নয়নের জন্য জীবন্ত ফলের যাদুঘর. ওয়াটার কোয়ালিটি ল্যাব, দেশের একমাত্র কৃষি যাদুঘর, দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার একমাত্র উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়ের ক্লিনিক এবং মাৎস্য যাদুঘর, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্র (বাউএক), সীড প্যাথলজি, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বায়োটেকনোলজি ল্যাব, ভেটেরিনারি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন কৃষি সম্পর্কিত সুবিধা সম্বলিত স্থাপনা। এছাড়াও দেশের কৃষি সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এসবুজ ক্যাম্পাসেই অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ দিয়ে। ২৩টি শিক্ষা বিভাগে তখন মাত্র ৩০ জন শিক্ষক ছিলেন। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৪৪৪ জন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস পর ১৯৬২ সালে দেশের পশুসম্পদকে উন্নত করার লক্ষ্যে পশুপালন অনুষদ নামে তৃতীয় একটি অনুষদ যুক্ত হয়। এরপর ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ এবং ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের আওতায় ৪৩ টি বিভাগে মোট ৫৩৩ জন শিক্ষক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে ৩,২৮৮ জন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১,৩০১ জন এবং পিএইচডি পর্যায়ে ২৮৩জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এযাবত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৩,২৭০ জন স্নাতক, ১২,৭৮৪ জন স্নাতকোত্তর এবং ৩৫৫ জন পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছে (৩১ ডিসেম্বর ২০১০ অনুযায়ী)। উলে¬খ্য, জামালপুর জেলার মেলান্দহে অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মাৎস্যবিজ্ঞান কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধিভূক্ত। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোবেল বিজয়ী কৃষিবিজ্ঞানী ড. নরম্যান ই. বোরগলকে সম্মানসূচক ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদার ও সমস্যার মোকাবিলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশী গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে ফল-ফসলের জাতসহ নিত্য-নতুন কৃষি প্রযুক্তি। শস্যবিজ্ঞান সংশি¬ষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে- অধিক ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন; বিভিন্ন ফলের জাত উদ্ভাবন; শস্য ক্ষেতে সহজে রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি; বোরো মৌসুমে কম পানি ব্যবহার করে বোরো ধান উৎপাদনের কলাকৌশল, বীজ শোধন যন্ত্র। পশুসম্পদ বিজ্ঞান সংশি¬ষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে মোরগ-মুরগির রানীক্ষেত রোগ, হাঁসের পে¬গ ভ্যাকসিন, কৃত্রিম পশুপ্রজনন প্রযুক্তি, কোয়েলের উচ্চ উৎপাদনশীল জাত, সয়াদুধ ইত্যাদি। নতুন নতুন কৃষি প্রকৌশল সংশি¬ষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে স্বল্প ব্যয়ে সেচ নালা তৈরি, বাকৃবি জিয়া সার-বীজ ছিটানো যন্ত্র, সোলার ড্রায়ার, স্বল্প ব্যয়ে হস্তচালিত ধান কাটার মেশিন, পাতা দেখে উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, ইলিশ মাছ আহরণের পর মানসম্মত উপায়ে বরফজাতকরণ, স্বল্প খরচে মাছ সংরক্ষণে বরফ বাক্স, মাছের প্রাকৃতীক খাবার পেরিফাইটন, এলোজাইম মার্কার ব্যবহার করে পিতামাতার সাথে ক্রস কৈ মাছের কৌলিতাত্ত্বিক পার্থক্য নিরূপণ প্রভৃতি উলে¬খযোগ্য। যা বর্তমানে দেশের মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করে দেশকে খাদ্য নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এত সবকিছুর মাঝে রয়েছে অসংখ্যা সমস্যা। তার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় গত ৫০ বছরে দেশের মানুষ ও কৃষি যা দিয়েছে, তা প্রসংশার দাবিদার। তবে ভবিষ্যতে এ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক, দেশ রূপে পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলে ধরতে কাজ করে যাবে। এটাই আগামী ১৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অঙ্গীকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ