বৃহস্পতিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১১

ইবিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা

ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে মঙ্গলবারের সংগঠিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আবারো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকায় বিশ্ববিদ্যালয় আগামী ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার মধ্যে আবাসিক হল ছাড়তে শিক্ষার্থীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আবাসিক হল বন্ধ রাখার ঘোষণায় হতবাক হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত রহস্যজনক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ভর্তিইচ্ছুরা। সংঘর্ষের আশংকায় ছাত্র-ছাত্রীরা পরিবহন ধর্মঘট সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতোমধ্যে আবাসিক হল ছাড়তে শুরু করেছে। এদিকে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রহস্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বলে ক্যাম্পাসে শতশত পুলিশ অবস্থান নিলেও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাসে আগ্নেঅস্ত্রসহ অবস্থান করছেন বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। ক্যাম্পাসের উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্নবৃদ্ধ ভূমিকার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইবি শিক্ষক সমিতি, শিক্ষকদের সংগঠন জিয়া পরিষদ, গ্রীণ ফোরাম, ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন সংগঠন। সূত্র মতে, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের লালনশাহ হলের ডাইনিং ম্যানেজার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে উভয় সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। দীর্ঘ দিন ধরে ছাত্রলীগের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবিরের সাথে যোগ দিয়ে ছাত্রলীগকে প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়ে ছাত্রলীগ শতশত বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া বাজার থেকে ৪নং গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে শিবির কর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে ছাত্রলীগ কে প্রতিহত করে। এসময় ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাস লক্ষ্য করে অন্তত: ১০০ রাউন্ড গুলি ও মুহুমুহ বোমা নিক্ষেপ করে। র্দীঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে সন্ধা ৬টার দিকে শতশত পুলিশ ও র‌্যাব ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এসময় পুলিশ ২৮ রাউন্ড ট্রিয়ারশেল, ২৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানান। দফায় দফায় চেষ্টা করেও শিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি।
রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দকে নিয়ে প্রশাসন ভবনে সমজোতা বৈঠক করে। বৈঠকে উভয় সংগঠন সহাবস্থানের পক্ষে মত দিলেও বুধবার পর্যন্ত ছাত্রলীগ আবাসিক হলে যায়নি। বেলা ১২টার দিকে ছাত্রলীগ কর্মীরা ১০/১২টি মটর সাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দিলে পরিস্থিতি আবারো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুর ২টায় প্রভোস্ট কাউন্সিলের জরুরী বৈঠকে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আবাসিক হলসহ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার মধ্যে আবাসিক হল ছাড়ার জন্য ইতোমধ্যে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার ৭৯ হাজার ২২ জন শিক্ষার্থী ইবির ভর্তি ফরম সংগ্রহ করেছে। ভর্তি পরীক্ষাকে বিঘিœত করা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দূরের মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে ভর্তি থেকে বিরত রেখে স্থানীয়দেরকে সুযোগ করে দেওয়ার অংশ হিসেবে একের পর এক সংঘর্ষ ও ক্যাম্পাসে গুলি, বোমা ফাটানোর ঘটনা ঘটছে বলে সচেতন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। তার উপর ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আবাসিক হল বন্ধের ঘোষণায় হতবাক হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ভর্তিইচ্ছুরা। কুষ্টিয়া শহর থেকে ২৪ কি:মি: এবং ঝিনাইদহ শহর থেকে ২২ কি:মি: দূরে গ্রামীণ পরিবেশে অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বিপুল সংখ্যক ভর্তিইচ্ছু শিক্ষার্থী কোথায় থাকবেন তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। হল বন্ধের এ ঘোষণাকে রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা গেছে, মূলত: ছাত্রলীগকে উস্কানী দিয়ে ছাত্রশিবিরের উপর হামলা এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ন্যপথ্যে কাজ করছেন ক্যাম্পাসে ভিসি বিরোধী বলে পরিচিত আওয়ামীপন্থী কয়েক শিক্ষক-কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামীপন্থী বলে পরিচয়দানকারী কয়েক শিক্ষক দীর্ঘ দিন ধরে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলে ভিসি প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে লালসা পুরণ না করতে পেরে বর্তমানে তারা ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রক্টর পদ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলের জন্য পায়তারা করছেন। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবারের সংঘর্ষ চলাকালে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্ট আক্তারুল ইসলাম জিল্লু সংঘর্ষ না থামিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের উস্কানী ও বিভিন্ন ভাবে উৎসাহ দিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখ্য, গত রমজান মাসে ক্যাম্পাস ছুটিকালীন সময়ে ১৪ আগষ্ট তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ছাত্রশিবিরের উপর সশস্ত্র হামলা চালায়। এতে অন্তত: ২০ শিবির কর্মী গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের সহায়তায় লালনশাহ এবং শহীদ জিয়াউর রহমান হল নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্রলীগ। এর পর তারা শুরু করে নজিরবিহীন লুটপাট। শতশত বহিরাগত নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতে শিবির কর্মীদের বিভিন্ন রুমসহ সাধারণ ছাত্রদের প্রায় শতাধিক রুমের তালা ভেঙে ব্যাপক লুটপাট করে। এদুটি হল থেকে এসময় প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। এক তথ্যে জানা যায়, দুটি হল থেকে প্রায় ৮০টি কম্পিউটার(ডেস্কটপ), ৪৫টি ল্যাপটপ, শার্ট-প্যান্ট, কয়েক হাজার বই-কিতাব, এমনকি পুরাতন আন্ডারওয়্যার পর্যন্ত নিয়ে যায়। এঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কোন ক্ষতিপুরণ দেওয়া হয়নি। শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা গত মঙ্গলবার সংগঠিত সংঘর্ষের সময় প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইবি শিক্ষক সমিতি, শিক্ষকদের সংগঠন জিয়া পরিষদ, গ্রীণ ফোরাম, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মোহা: তোজাম্মেল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আ.ছ.ম তরিকুল ইসলাম স্বাক্ষরীত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিপূর্বে সংগঠিত সংঘর্ষের ঘটনার কোন বিচার না হওয়ায় একই ঘটনা পূন:পূন: ঘটছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাপক ভাবে বিঘিœত হচ্ছে এবং সেশনজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্তা ভেঙ্গে পড়েছে এবং ছাত্র-শিক্ষকসহ সকলে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচী প্রধান করা হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।’ এব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিন বলেন-‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রীক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে ক্যাম্পাসসহ আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমনিতেই ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে যাবতীয় কাজ করার জন্য সময় প্রয়োজন। ভর্তিপরীক্ষার সময় হল বন্ধের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি পরবর্তীতে পূণবিবেচনা করা হবে বলে জানান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ