স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দাবি করেছেন
ফিলিস্তিন স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রধান মাহমুদ আব্বাস। ইহুদিবাদী ইসরাইল ও
যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বিরোধিতা ও নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন ভেটো দেয়ার
হুমকি সত্ত্বেও এ দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে, নিউ ইয়র্কে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার পর তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব
বান কি মুনের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠনিকভাবে লিখিত আবেদন হস্তান্তর করেন। এর
কিছুক্ষণ পর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবির
পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আব্বাস বলেন, “ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি
শান্তিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি জাতিসংঘে স্বাধীন
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” তিনি বলেন, ইসরাইল
সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক সব মহলের সমস্ত
আন্তরিক প্রচেষ্টা ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যকার
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকে
দায়ী করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা শান্তির জন্য ইসরাইল সরকার ও সে
দেশের জনগণের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, শান্তি আলোচনাতেও অংশ নিয়েছি।
কিন্তু ইহুদি বসতি স্থাপন অব্যাহত থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।”
ফিলিস্তিন জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি মেনে নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৪তম সদস্য
করে নেয়ার জন্য তিনি নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। জাতিসংঘে
মাহমুদ আব্বাসের এ বক্তব্যকে ব্যাপক করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানান বিশ্বের
বিভিন্ন দেশের নেতা।
এদিকে, শনিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আলোচনায় প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস
আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দাবি পেশ করবেন বলে কথা রয়েছে। এ বিষয়ে মাহমুদ আব্বাসের
পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, মাহমুদ
আব্বাসের এই আবেদন অনুমোদনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে পাঠাবেন জাতিসংঘ
মহাসচিব বান কি মুন। সেখানে প্রস্তাবটি পাস হতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫
সদস্যের মধ্যে নয় সদস্যের সমর্থন লাগবে। তবে এ পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের
কেউ ভেটো দিলে বিষয়টি বাতিল হয়ে যাবে। নিরাপত্তা পরিষদে পাস হলে চূড়ান্ত
অনুমোদনের জন্য সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পেতে হবে
ফিলিস্তিনকে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে চীন ও রাশিয়া
এরইমধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। আর নিরাপত্তা পরিষদের
অস্থায়ী সদস্য দেশের মধ্যে এ স্বীকৃতি দেয়ার তালিকায় রয়েছে, বসনিয়া-
হারজেগোভিনা, ব্রাজিল, গ্যাবন, ভারত, নাইজেরিয়া, লেবানন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১২৯টিই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি
দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত ২০ বছরের শান্তি আলোচনার মতো আব্বাসের এ
প্রস্তাবও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। গত ২০ বছর ধরে দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি
প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতা করছে ইহুদিবাদী ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।
দীর্ঘ সময় ধরে কথিত শান্তি আলোচনা চললেও তা শান্তির মুখ দেখাতে পারেনি।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ পূর্ববর্তী সীমান্ত অনুযায়ী পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও
গাজা নিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে চায় ফিলিস্তিনিরা।
কিন্তু, ইহুদিবাদী ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য
জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদের বিরোধিতা করে বলছে, তেলআবিবের সঙ্গে সরাসরি
আলোচনার মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র অর্জিত হতে পারে, জাতিসংঘের প্রস্তাবের
মাধ্যমে নয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আলোচনার নমে সময়ক্ষেপণ করে স্বাধীন
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখার জন্য
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইল এ বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সৈন্যদের গুলিতে আজ এক ফিলিস্তিনি শহীদ
হয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে বলে ফিলিস্তিনের হাসপাতাল ও
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে চীনা বার্তা সংস্থা শিনহুয়া খবর দিয়েছে। এর
আগে বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। জাতিসংঘে
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি জানালে যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয়ার যে
ঘোষণা দিয়েছে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে ফিলিস্তিনিরা।
স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপনকে কেন্দ্র করে ইসরাইলি
সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী বলেছে, চেক
পয়েন্ট ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি ২০ হাজার সদস্য
নিয়োগ করা হয়েছে।
এদিকে, অধিকৃত জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের বেশিরভাগ শহরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি
স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে মিছিল শুরু করেছে। নাবলুস, রামাল্লা ও আল
খলিলসহ পশ্চিম তীরের ছোট-বড় সব শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। টেলিভিশন
ফুটেজে দেখা গেছে-পশ্চিম তীরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষ
রাস্তায় নেমে এসেছেন এবং সড়কগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। জর্দান এবং
মিশরেও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সমর্থনে মিছিল হয়েছে। এ সময়
মিছিলকারীরা ইহুদিবাদী ইসরাইলের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়। অপরদিকে, আব্বাসের
বক্তব্য উপস্থাপনের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার
যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।
সু্ত্র রেডিও তেহরান
সু্ত্র রেডিও তেহরান

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন